রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনী শুরু করার আগে আমাদের জানতে হবে—তিনি কোন পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
প্রায় ১,৪০০ বছরেরও বেশি আগে আরব উপদ্বীপ ছিল বিস্তীর্ণ মরুভূমি, পাহাড়, উপত্যকা, বাণিজ্যপথ, গোত্র ও বিভিন্ন জনবসতিতে গঠিত একটি বিশাল অঞ্চল। সমগ্র আরব কোনো একক রাজ্যের অধীনে ছিল না। কেউ শহর ও মরূদ্যানে বসবাস করত, আবার কেউ উট ও অন্যান্য পশু নিয়ে পানি ও চারণভূমির সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাযাবর জীবনযাপন করত।
ষষ্ঠ শতকে আরব উপদ্বীপ পার্শ্ববর্তী বিশ্বের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক, পূর্ব আফ্রিকা এবং বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্য ও রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল।
কিন্তু আরবের অসংখ্য শহরের মধ্যে একটি শহর খুব শীঘ্রই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের কেন্দ্র হয়ে উঠবে:
মক্কা।
১. মক্কা — পবিত্র নগরী
মক্কা ছিল আরব উপদ্বীপের পশ্চিমাঞ্চলের একটি দুর্গম উপত্যকায় অবস্থিত শহর। কৃষির জন্য এর প্রাকৃতিক সুবিধা খুব বেশি ছিল না।
কিন্তু এর ধর্মীয় গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে সংযোগ মক্কাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল।
মক্কার কেন্দ্রস্থলে ছিল কাবা।
আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা বাক্কায় অবস্থিত—বরকতময় এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য পথনির্দেশক।”
— সূরা আলে ইমরান ৩:৯৬
কুরআনে আরও এসেছে যে ইবরাহিম عليه السلام মক্কার নিরাপত্তার জন্য দোয়া করেছিলেন এবং নিজে ও তাঁর সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন যে তাঁর বংশধরদের একটি অংশকে পবিত্র ঘরের নিকটবর্তী অনুর্বর উপত্যকায় বসতি স্থাপন করানো হয়েছিল, যাতে তারা সেখানে সালাত প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের বহু আগে থেকেই মক্কার একটি বিশেষ পবিত্র ইতিহাস ছিল।
২. কাবা ও হজ
কাবা শুধু মক্কার একটি ভবন ছিল না। এর সঙ্গে ইবরাহিম ও ইসমাইল عليهما السلام-এর তাওহীদের ঐতিহ্য গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল।
কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ ইবরাহিম ও ইসমাইল عليهما السلام-কে তাঁর ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী এবং রুকু-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই একত্ববাদের শিক্ষা মানুষের বিভিন্ন বিশ্বাস ও প্রথার সঙ্গে মিশে যায় এবং কাবাকে কেন্দ্র করে মূর্তিপূজা ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসলামের আগমনের ঠিক পূর্বে মক্কা তখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান ছিল। আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এই পবিত্র স্থানে আসত।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:
পবিত্র ঘরটি রয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার চারপাশের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল।
৩. গোত্রভিত্তিক সমাজ
ইসলামের পূর্ববর্তী আরব সমাজে গোত্রের পরিচয় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষের গোত্র তাকে পরিচয়, নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, সহযোগিতা এবং প্রয়োজনে প্রতিরক্ষা প্রদান করত।
সমগ্র আরব উপদ্বীপের ওপর নিয়ন্ত্রণকারী কোনো একক কেন্দ্রীয় সরকার ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন গোত্র ও স্থানীয় শাসকরা প্রভাব বিস্তার করত। গোত্রগুলোর মধ্যে কখনো জোট গড়ে উঠত, আবার কখনো সংঘর্ষ ও যুদ্ধ হতো।
এই গোত্রভিত্তিক সমাজে কিছু প্রশংসনীয় গুণ ছিল।
যেমন:
- সাহসিকতা
- অতিথিপরায়ণতা
- দানশীলতা
- প্রতিশ্রুতি রক্ষা
- পরিবার ও গোত্রের প্রতি আনুগত্য
- কবিতা ও ভাষার প্রতি গভীর আগ্রহ
কিন্তু একই গোত্রভিত্তিক আনুগত্য অনেক সময় প্রতিশোধ, দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ এবং যুদ্ধের কারণও হয়ে উঠত।
যাদের শক্তিশালী গোত্র বা সামাজিক নিরাপত্তা ছিল না, তারা অনেক সময় দুর্বল অবস্থানে থাকত।
৪. ইসলামের পূর্বে আরবের ধর্মীয় অবস্থা
ইসলামের আগমনের আগে আরবের সবাই একই ধর্মের অনুসারী ছিল না।
আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। বহু মানুষ মূর্তিপূজার সঙ্গে যুক্ত ছিল। একই সময়ে আরবের বিভিন্ন অংশে ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও ছিল এবং পারস্য-প্রভাবিত অঞ্চলে জরথুস্ত্র ধর্মের প্রভাবও দেখা যেত।
মক্কায় মূর্তিপূজা বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
অন্যদিকে কুরআন মানুষকে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করে এবং ইবরাহিম عليه السلام-এর সেই দোয়া স্মরণ করিয়ে দেয়:
“হে আমার রব! এই নগরীকে নিরাপদ করুন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন।”
— সূরা ইবরাহিম ১৪:৩৫
এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে ইসলামের তাওহীদের আহ্বান আরবের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো নতুন ধারণা ছিল না।
বরং ইসলাম মানুষকে ইবরাহিম عليه السلام-এর বিশুদ্ধ একত্ববাদের দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছিল।
৫. সামাজিক ও নৈতিক সমস্যা
ইসলামী সূত্রে ইসলামের পূর্ববর্তী যুগকে জাহিলিয়াতের যুগ বলা হয়।
এর অর্থ এই নয় যে সেই সময়ের প্রত্যেক মানুষ খারাপ ছিল কিংবা আরব সমাজে কোনো ভালো গুণ ছিল না।
বরং জাহিলিয়াত এমন একটি ধর্মীয় ও নৈতিক অবস্থাকে বোঝায় যেখানে মানুষের বিশ্বাস ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের অনেক কিছুই আল্লাহর নির্দেশনা থেকে বিচ্যুত ছিল।
সেই সমাজে সাহস, দানশীলতা ও অতিথিপরায়ণতার মতো ভালো গুণ যেমন ছিল, তেমনি গুরুতর সামাজিক সমস্যাও ছিল।
কুরআন বিশেষভাবে কন্যাশিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়ার ভয়াবহ প্রথার নিন্দা করেছে:
“আর যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?”
— সূরা আত-তাকভীর ৮১:৮–৯
এছাড়াও গোত্রগত প্রতিশোধ, দুর্বলদের ওপর অন্যায়, সামাজিক বৈষম্য এবং বিভিন্ন ধরনের শোষণ সমাজে বিদ্যমান ছিল।
পরবর্তীতে ইসলাম ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, দয়া, দান, জবাবদিহিতা এবং দুর্বলদের অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
৬. মক্কা — বাণিজ্যের কেন্দ্র
মক্কার গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় ছিল না।
এর ভৌগোলিক অবস্থান বিভিন্ন আঞ্চলিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে যুক্ত ছিল। মক্কার কুরাইশরা ধীরে ধীরে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করে।
কুরআনে কুরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মের সফরের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে:
“কুরাইশদের নিরাপদ বাণিজ্যযাত্রার জন্য—তাদের শীত ও গ্রীষ্মের সফরের নিরাপত্তার জন্য...”
— সূরা কুরাইশ ১০৬:১–২
ঐতিহাসিক বিবরণেও মক্কাকে একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং একই সঙ্গে একটি পবিত্র স্থান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ধর্মীয় পবিত্রতা ও নির্দিষ্ট সময়ের যুদ্ধবিরতি বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রার জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করেছিল।
অর্থাৎ মক্কার গুরুত্ব গড়ে উঠেছিল ধর্ম, তীর্থযাত্রা, গোত্রগত নেতৃত্ব এবং বাণিজ্য—এই কয়েকটি বিষয়কে কেন্দ্র করে।
৭. কুরাইশ
মক্কার সমাজে কুরাইশ ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি গোত্র।
কুরাইশের বিভিন্ন শাখা ও পরিবার মক্কার সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। তাদের মধ্যে ছিল বনু হাশিম—যে বংশে জন্মগ্রহণ করবেন মহানবী মুহাম্মদ ﷺ।
কুরাইশদের বাণিজ্যিক যোগাযোগ মক্কার সীমানার বাইরেও বিস্তৃত ছিল।
তাই মুহাম্মদ ﷺ এমন একটি সমাজে বড় হতে যাচ্ছিলেন যেখানে তিনি শুধু নিজের গোত্রের মানুষই দেখবেন না; বরং ব্যবসায়ী, ভ্রমণকারী, বিভিন্ন গোত্রের নেতা এবং নানা অঞ্চলের মানুষের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
৮. পরিবর্তনের অপেক্ষায় একটি পৃথিবী
তাহলে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জন্মের আগে আরব কেমন ছিল?
এটি ছিল বৈপরীত্যে ভরা একটি সমাজ।
সেখানে সাহস ছিল, কিন্তু অন্যায়ও ছিল।
দানশীলতা ছিল, কিন্তু শোষণও ছিল।
কবিতা ও ভাষার অসাধারণ সৌন্দর্য ছিল, কিন্তু ধর্মীয় বিভ্রান্তিও ছিল।
ইবরাহিম عليه السلام-এর সঙ্গে সম্পর্কিত পবিত্র কাবা ছিল, কিন্তু তার চারপাশে মূর্তিপূজাও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।
গোত্রের মধ্যে শক্তিশালী বন্ধন ছিল, কিন্তু সেই বন্ধন অনেক সময় বিভেদ ও প্রতিশোধের কারণ হয়ে উঠত।
আর ঠিক এমন একটি পৃথিবীতেই আল্লাহ তাঁর শেষ রাসূলকে পাঠাবেন।
আল্লাহ বলেন:
“আর আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।”
— সূরা আল-আম্বিয়া ২১:১০৭
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের গল্প এমন কোনো পৃথিবীতে শুরু হয়নি যার কোনো ইতিহাস ছিল না।
এই গল্প শুরু হয়েছিল মক্কায়—একটি এমন শহরে যার পবিত্র ইতিহাস ইবরাহিম ও ইসমাইল عليهما السلام-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল; যে শহর ছিল তীর্থযাত্রা ও বাণিজ্যের কেন্দ্র; এবং যে সমাজের গভীর প্রয়োজন ছিল আল্লাহর হিদায়াতের।
আর খুব শীঘ্রই সেই শহরেই জন্ম নেবেন এমন এক শিশু, যার জীবন মানব ইতিহাসের গতিপথ চিরদিনের জন্য বদলে দেবে।
তিনি হলেন—মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ ﷺ।
চলবে...
পর্ব ২: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র বংশপরিচয়
পরবর্তী পর্বে আমরা জানব রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বংশপরিচয়, বনু হাশিম, তাঁর পিতা আবদুল্লাহ এবং তাঁর জন্মের পূর্ববর্তী পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে।
